
হেনরী স্বপনঃ
দেখা হলেই পরম স্নেহে যে মানুষটি আমাকে কবি’ বলে ডাকতেন। এখানকার পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয়ে আমার যে দুএকটি লেখা ছাপা হত, গভীর মনোনিবেশে তিনি তা পাঠ করতেন। তারপর প্রায়শই ফোন করে কিংবা দেখা হলে সেইসব লেখার পক্ষ-বিপক্ষের যুক্তিতে সরল আন্তরিকতায়- তাঁর মতামত প্রকাশ করতেন। আমার সাথে মো. ইসমাইল হোসেন নেগাবান মন্টু এমোনি পরমাত্মীয়ের সম্পর্ক ছিল, এটুকু বলাই যায়।
তাহলে, নেগাবান মন্টু মূলত কি, শুধুই একজন সাংবাদিক ছিলেন? না…! পেশাগত পরিচয়ে তিনি ছিলেনÑ পুরোদস্তুর একজন সৎ, স্পষ্টবাদী ও নির্লোভী আইনজীবী। সাংবাদিকতা ছিল তাঁর প্যাশন। যে সাংবাদিকতা একটা সময় সমাজের মানুষের কল্যাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও, আজকাল তা নানাভাবেই বিতর্কিত। যা কেবল অর্থনৈতিক, চ্যালেঞ্জিং, আদর্শিক ও নৈতিক-অনৈতিক নানা কারণেই বিতর্কিত।
আবার আইন পেশাও ঐতিহাসিকভাবে একটি ‘রয়েল প্রফেশন’Ñ বা সন্মানজনক পেশাই ছিল বটে। বর্তমানে সেই রয়েল সততার গুড়ে বালি ঢেলে, অঢেল অর্থ উপার্জণের নিমিত্তে মক্কেলের সঙ্গে প্রতারণা, রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের ঘূর্ণিতে মহান নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্যুত হয়েÑ এই পেশার মানুষগুলোও নৈতিক স্খলনের অভিধায় আভিযুক্ত। অথচ নেগাবান মন্টু উল্লেখিত এই দুই পেশায়ই দীক্ষিত ছিলেন এবং সেটা অনন্য সুনামের প্রেক্ষিতেই ছিলেন।
কারণ, মন্টু ভাই ছিলেন কলম হাতে স্পষ্টতই নিষ্ঠা ও সাহসে অপ্রতিরোধ্য প্রতিবাদী এবং আইনজীবী হিসেবে- বরাবরই তিনি পেশার পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষার জন্য ব্যক্তিগত লোভ কিংবা অনৈতিকতার উর্ধ্বে থেকে সততার সাথে নিজেকে মহৎ ও মানবকল্যাণমূলক দায়বদ্ধতার মুখোমুখি দাঁড় করাতে পেরেছিলেন। এজন্যেই সে এই মহান দুই পেশার সকল বিতর্কের মধ্যেও মহান সম্মানের মানুষ ছিলেন। কারণ তিনি জানতেন। মনেপ্রাণেই বুঝতেন যে, দীর্ঘমেয়াদী পেশাগত সাফল্যের জন্য মহত্বম সততার প্রাতিষ্ঠানিকতাই জীবনের জন্য অনেক বেশি অপরিহার্য। মিথ্যা বা ছলছাতুরি, নীতিবর্জিত কাজের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্য কখনোই স্থায়ী এবং টেকসই হয়না কখনো।
মন্টু ভাই, সহজ সরল ভাষায় কঠিন স্পষ্টবাদী এটা যেন তাঁর দীর্ঘদেহী পরিপূর্ণ জীবনের সমান সত্যের মতোই উজ্জ্বল ছিলেন তিনি। সততা ও স্বজ্জনতার বর্মে আচ্ছাদিত এই মানুষটিকে বিগত প্রায় এক যুগেরও আগেÑ বরিশালে টিআইবির কার্যক্রম শুরু হলে, তখন সচেতন নাগরিক কমিটিÑ সনাকের মাধ্যমে আমি প্রথম এই মানুষটির কাছাকাছি হতে পেরেছিলাম। তিনি বরিশাল সনাকের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তখন টিআইবি যথার্থই একজন হিরণ¥য় আলোকিত মানুষকে খুঁজে পেয়েছিলেন।
একটানা চার/পাঁচ বছর যুক্ত ছিলেন। সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন কয়েকবছর। কিন্তু এনজিও কর্মকাণ্ডের অনৈতিকতা, অসচ্ছতা, লক্ষ্য ও আদর্শ বিচ্যুতি এবং নির্বাহী আত্মীয়তা, একই সাথে জবাবদিহিতাবিহীন কর্পোরেট কর্মকাণ্ডকে তিনি তাঁর মতের এবং আত্মবিশ্বাসের পরিপন্থী ও আদর্শবিবর্জিত কাজ মনে করেÑ টিআইবির মতো একটি ক্লাশ এনজিওর সকল কর্মকাণ্ড থেকে, খুব সহজেই নিজেকে স্বেচ্ছায় গুঁটিয়ে নিয়েছিলেন বহু আগেই।
যদিও মৃত্যুর পরে কেবল ফুলের চাকমালা আর শ্রদ্ধাঞ্জলির শোক দিয়ে কিছু মানুষের গুরুত্বের পরিমাপ করা সম্ভব নয়। অন্তত প্রীতি প্রজ্ঞা আর উন্নত শির বলতে বলতে যদি আমাদের মাঝে একটুও পবিত্র আবেগ বা যুক্তির আলো ফুটে ওঠে, সেই আলোতেই যেন জা¦লজ্বলে হয়ে জেগে থাকবেনÑ অতুলনীয় নেগাবান মন্টু…।
লেখক : কবি ও দৈনিক মতবাদের যুগ্ম সম্পাদক।